প্রাণীজ খাবার প্রসঙ্গে হিন্দুধর্ম


এই নিবন্ধটি সেইসব প্রতারক হিন্দু পণ্ডিতদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীত যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে ১২ মাস বাকি হিন্দুদের প্রাণীজ খাবার গ্রহণের নিষিদ্ধতার বিধান শোনাই। 
বস্তুত, মানুষের কাছে হোক সেটা নিরামিষ বা আমিষ খাবারের প্রতি আসক্তি পুরোটাই তার ব্যাক্তিগত পছন্দতার উপরে নির্ভরশীল এবং হিন্দু গ্রন্থ সমূহ হোক সেটা বৈদিক বা পৌরাণিক বা অন্যান্য, সবক্ষেত্রে নিরামিষ ও আমিষ দুটিরই বিধিসম্বত দৃষ্টান্ত আছে। তাই কোনো হিন্দুর যদি নিরামিষ খাবার ভালো লাগে তো সেই তাই খাবে, কোনো হিন্দুর যদি আমিষ খাবার ভালো লাগে তো সেই তাই খাবে। 
কিন্তু এখানে তৃতীয় ব্যাক্তি হয়ে ওইসব হিন্দু পণ্ডিতরা ধর্মে নিষিদ্ধতার দোহাই লাগিয়ে বাকি হিন্দুদের ১২ মাসই প্রাণীজ খাবার খেতে বাধা দান করার কে? 
সেইসব কপটাচারীরা দেখলাম কিছু আধুনিক মনগড়া তত্ত্ব আবিস্কার করেছে, যেমন :- 
মাংস আহার নাকি বেদ বিরুদ্ধ! 
মাংস নাকি আসুরিক খাবার! 
মাংস খেলে নাকি তমঃ গুণে আচ্ছাদিত হয়ে যায়! 
মাংস খেলে পরজন্মে সেই ভোক্তাকে আহার করবে! 
মাংস নাকি পশুদের খাদ্য! 
প্রাণীজ আহার গ্রহণ সনাতন ধর্ম বিরুদ্ধ! 
ইত্যাদি........ইত্যাদি..........
নিরামিষ ভোজী ওইসব হিন্দু পণ্ডিত ব্যাক্তি বর্গদের কথা তো শুনলেন, চলুন এবার এক এক করে উল্লেখযোগ্য হিন্দুধর্মীয় গ্রন্থ থেকে দেখে নিই সেখানে প্রাণীজ খাবার আহারের কোনো দৃষ্টান্ত আছে কি নাই? 


(বৈদিক গ্রন্থসমূহ থেকে দৃষ্টান্ত)
কল্প হল বেদাঙ্গের অন্যতম শাখা যাতে বৈদিক আচার অনুষ্ঠান পদ্ধতির বর্ণনা আছে। এই কল্পের একটি অংশ হল গৃহসূত্র যাতে মূলত বৈদিক গার্হস্থ্য আচার অনুষ্ঠানের বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। এখানেও কিন্তু প্রাণীজ খাবার গ্রহণের বহু দৃষ্টান্ত আছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু উদাহরণ নিচে তুলে ধরা হল :- 

[১] ঋগ্বেদের  শাঙ্খায়ন গৃহসূত্র ১.২৭.১-৬ তে অন্নপ্রাশনের অনুষ্ঠানে মাছ ও মাংস খাওয়ানোর উল্লেখ আছে। 

[২] অনুরূপ দৃষ্টান্ত শুক্ল যর্জুবেদের পারস্কর গৃহসূত্র ১.১৯.৭-১৩ তে পাওয়া যায়, যেখানে অন্নপ্রাশনে পাখির মাংস ও মাছ খাওয়ানোর উল্লেখ আছে। 

[৩] সামবেদের গোভিলী গৃহসূত্র ৩.১০.১-৬ তে অষ্টকে (একটি শীতকালীন বৈদিক অনুষ্ঠান) মাংস নিবেদনের মাধ্যমে পালন করার উল্লেখ আছে। 

[৪] কৃষ্ণ যর্জুবেদের আপস্তম্ব ধর্মসূত্রের ২.১০.২৫.৮-১০ তে উল্লেখ করা হয়েছে - বাড়িতে বেদজ্ঞ অতিথি এলে, তাকে তার গুণমান অনুসারে থাকার ঘরের সাথে সাথে মাংস এবং পানীয় নিবেদন করতে।

[৫] বশিষ্ট ধর্মসূত্র ১৪.৪৮ তে কোন কোন পাখির মাংস খাওয়া যায় না, তার উল্লেখ আছে। 



এছাড়া আপস্তম্ব ধর্মসূত্রের ১.৫.১৭.২৯ ও ১.৫.১৭.৩৯ তে নিষিদ্ধ মাংসের বিবরণ আছে।

এছাড়া গৌতম ধর্মসূত্রের ১৭.৩১-৩৪ তেও নিষিদ্ধ মাংসের বিবরণ আছে 

কল্প গুলোতে আরো বহু নিষিদ্ধ মাংসের দৃষ্টান্ত আছে, তবে নিবন্ধটি অধিক বড় হয়ে যাবে বলে বেশি উল্লেখ করছি না। 

[৬] শতপথ ব্রাহ্মণে ১১.৭.১.৩ তে উৎসর্গীকৃত মাংস কে একটি ভালো খাবার হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

যজ্ঞে উৎসর্গীকৃত পশুর ব্যাপারে রামানুজাচার্য ভগবত গীতার ২.৩২ ভাষ্যতে উল্লেখ করেছেন উৎসর্গীকৃত পশু সমূহ পরজন্মে একটি ভালো জীবন প্রাপ্ত করে। 

এছাড়া ব্রহ্মসূত্রের ৩.১.২৫ তে উল্লেখ আছে "যজ্ঞে পশুবধ করে জীব অশুদ্ধ হয় না, ইহা শাস্ত্রেই উল্লেখ আছে"।
এখানে যজ্ঞে পশুবধ বলতে চন্দ্রায়ণ যজ্ঞে পশু উৎসর্গকে বুঝানো হয়েছে। 

বিড়ালতুল্য কিছু "আর্য সমাজী" আছে যারা সময় সময়ে বেদের বিভিন্ন শাখার ব্রাহ্মণ এবং কল্প গুলোকে মানে আবার সময় সময়ে প্রক্ষিপ্ত ও পরিত্যাজ্য বলে চালিয়ে দেয়!!! কিন্তু ভুলেও কোন কোন অংশ গুলি প্রক্ষিপ্ত ও পরিত্যাজ্য তার সূচী প্রকাশ করে না। 
আর যখন মাংস আহারের প্রসঙ্গ আসে তখন বেদ সংহিতা থেকে প্রমাণ দেখাই "বেদে প্রাণীজ খাবার গ্রহণের উল্লেখ নেই"। বাস্তবে এটা ওদের একটি এক তরফা দাবী! কারণ সংহিতার সাথে ব্রাহ্মণ(যাজ্ঞিক কর্মকাণ্ড) ও কল্প(আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড) গুলোর বিচার করলে এমন বহু প্রমাণ পাওয়া যাবে যেখানে কয়েক ক্ষেত্রে প্রাণীজ আহার গ্রহণে নিষেধ আছে,আবার কয়েক ক্ষেত্রে বিধিসম্বতও আছে। আমি এখানে মাত্র কয়েকটি ঐ রকম বিধিসম্বত দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছি, বেদের কর্মকাণ্ড গুলিতে ভুরিভুরি এমন দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু কিছু বিড়ালতুল্য আর্য সমাজীরা বেদ বলতে শুধুমাত্র বেদ সংহিতা ও উপনিষদ (শুধু আর্যসমাজী বিভিন্ন পণ্ডিতদের দ্বারা অনুবাদ কৃত) কেই বুঝে তাই ব্রাহ্মণ ও কল্প গুলোতে অগ্রাহ্য করে।



(বিধি বিধান প্রণেত স্মৃতিশাস্ত্র থেকে দৃষ্টান্ত) 
বিধি বিধান প্রণেত স্মৃতিশাস্ত্র গুলি বৈদিক শাস্ত্রের পরের অবস্থান করে, তাই বিধি বিধানের দ্বিতীয় স্তম্ভ হিসাবে স্মৃতিশাস্ত্র গুলি কাজ করে। এই প্রকৃতির স্মৃতিশাস্ত্র গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিসাবে মনু সংহিতা কে ধরা হয় এবং মনুর পরেই যাজ্ঞবল্ক সংহিতা কে ধরা হয়। চলুন এবার দেখে নিই দুটি উল্লেখযোগ্য স্মৃতিশাস্ত্রে প্রাণীজ খাবার আহারের কোনো দৃষ্টান্ত আছে কি নাই? 

বিশিষ্ট হিন্দু দার্শনিকরা শুধু মনু সংহিতার অংশ ভেদে প্রক্ষিপ্ত হিসাবে উল্লেখ করেছেন, সম্পূর্ণ মনু সংহিতা কে নয়। কিন্তু দয়ানন্দ জী একটু বেশিই মনগড়া মন্তব্য করেছেন তার সত্যার্থ প্রকাশে, (Satyarth Prakash, pg 142, Tr. Chiranjiva Bhardwaja) বাকি স্মৃতিগুলো মানুষ দ্বারা লিখিত এবং নির্বোধ পৌরাণিক কাহিনী থাকার জন্য এক মনু সংহিতা বাদে বাকি স্মৃতিশাস্ত্র গুলিকে "অস্বীকার্য"। যদিও উনি আবার পরেই স্বীকার করেছেন মনু সংহিতাতেও প্রক্ষিপ্ততা আছে।

এই মনু সংহিতাতে উল্লেখ আছে - ব্রহ্মা কি প্রাণী, কি উদ্ভিদ, এই উভয় জীবকে অন্ন হিসাবে নির্দ্দেশ করেছেন, তাই ভক্ষ্য বস্তু ও ভোক্তা উভয়কেই সৃষ্টি করেছেন, তাই প্রতিদিন প্রাণীসমূহের ভোজন করলেও দোষভাগী হয় না" 
→ মনু সংহিতা ৫.২৮-৩০ 


যাজ্ঞবল্ক হল শুক্ল যর্জুবেদের মাধ্যন্দিন শাখার একজন উল্লেখযোগ্য ঋষি। উনি উনার সংহিতাতেও উল্লেখ করেছেন "বেদ উৎসর্গ, তপস্যা ও শুভ কর্মের শিক্ষা দেয়" 
→ যাজ্ঞবল্ক সংহিতা ২.৪০ মিতাক্ষর ভাষ্য সহ

এছাড়া ঋষি যাজ্ঞবল্ক কয়েকটি স্থানে নিষিদ্ধ মাংসেরও প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। 
→ যাজ্ঞবল্ক সংহিতা ৭.১৭২ মিতাক্ষর ভাষ্য সহ 

তাহলে দুটি উল্লেখযোগ্য স্মৃতিশাস্ত্র তেও প্রাণীজ খাবার আহারের দৃষ্টান্ত পাওয়া গেলো। 



(পৌরাণিক গ্রন্থসমূহ থেকে দৃষ্টান্ত)
হিন্দুদের কাছে বেদের পরেই পুরাণ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। অধিকাংশ হিন্দুই বেদ না পড়লেও পুরাণ অবশ্যই পড়ে এবং বর্তমানে প্রচলিত হিন্দু সংস্কারের এক অংশ পুরাণ থেকে এসেছে। পুরাণ গুলি যদি ভালো ভাবে দেখা হয় তবে এখানেও প্রাণীজ খাবার আহার ও নিবেদনের দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে।

[১] ব্রহ্ম পুরাণ ৭৯.২১ তে গোবর্ধন পাহাড়ের পূজো, পশু উৎসর্গের মাধ্যমে হওয়ার উল্লেখ মেলে। 

এখানে উল্লেখ্য যে পৌরাণিক কাহিনী মতে গোবর্ধন পাহাড়ের পূজো করার পরামর্শ শ্রীকৃষ্ণ নিজেই দিয়েছিলেন বৃন্দাবনবাসীদের।

[২] অগ্নি পুরাণ ১৬৮.২১ তে বৈধ প্রাণীজ খাবারের বর্ণনা করতে গিয়ে স্পস্ট উল্লেখ করা হয়েছে কি কি প্রকৃতির মাছ ও মাংস খাওয়া যাবে। 

[৩] বায়ু পুরাণ ২.১৯.৩-৪ তে উল্লেখ আছে দ্বিতীয় অষ্টক (অনুষ্ঠান) মাংস নিবেদন করেই পালন করা উচিত। 

[৪] অগ্নি পুরাণ ৮৪.১ তে বন্ধনমুক্তি অনুষ্ঠানের নিয়মে মাংস খাওয়ার উল্লেখ করা হয়েছে :- 

[৫] অগ্নি পুরাণ ৪০.৪ তে উল্লেখ আছে গগনের অধিপতি অর্ধ চতুঃকৌণিক ভাবে অধিষ্ঠিত, যিনি তৃপ্ত হন পাখির মাংস দ্বারা। 

[৬] অগ্নি পুরাণ ৪০.৬ তে উল্লেখ আছে ধর্মের অধিপতি দ্বি-চতুষ্ক ভাবে অধিষ্ঠিত, যিনি পূজিত হন মাংস ও রন্ধন করা খাবার দ্বারা।

[৭] গরুড় পুরাণ ১৬৯.৬২ তে উল্লেখ করা হয়েছে খাদ্যের সাথে রন্ধন করা মাংস হল আয়ুর্বর্ধক।

[৮] হরিবংশ পুরাণ ২.১৭.১৭-২১ তেও এই গোবর্ধন পাহাড় পূজোর বিবরণ আছে এবং শ্রীকৃষ্ণর দ্বারা গোবর্ধন পাহাড় রূপে সেইসব নিবেদিত বস্তুর (আমিষ) আহারের কথাও উল্লেখ আছে। 

[৯] অনেকে আবার দোহাই দেয় কলিযুগে প্রাণীজ খাবার খাওয়া নিষিদ্ধ! যদিও বিভিন্ন পুরাণে বর্ণিত যুগধর্মের বর্ণনাতে এই মন্তব্যটি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে কলিযুগের যে কল্কি অবতারের কথা উল্লেখ আছে, তার দ্বারা ব্রাহ্মণ ভোজনের মেনুকার্ড টি একবার দেখবেন না?
কল্কি উপ-পুরাণ ৩০.১০-১৩ 


তাহলে পুরাণেও প্রাণীজ খাবার গ্রহণের দৃষ্টান্ত পাওয়া গেলো। 



(রামায়ণ থেকে দৃষ্টান্ত) 
বাল্মীকি মুনি তার রামায়ণে শ্রীরাম কে আর্যশ্রেষ্ঠ ও আর্যপুত্র হিসাবে বহুবার আখ্যায়িত করেছেন, এর সঙ্গে এই রামায়ণে শ্রীরাম দ্বারা পশু শিকার, মাতা সীতাকে খাবার জন্য মাংস নিবেদন ও লক্ষ্মণ দ্বারা মাংস রান্নার বিবরণও উল্লেখ করেছেন।

[১] বাল্মীকি রামায়ণ ২.৫২.১০২ অনুসারে ক্ষুধাকাতর রাম ও লক্ষ্মণ একটি বন্যশূকর, একটি সাদা পা ওয়াল পুরুষ কৃষ্ণসার, একটি ছোপ ছোপ দাগ বিশিষ্ট হরিণ এবং কালছে ফিতার ন্যায় দাগ বিশিষ্ট একটি বিরাট হরিণ শিকার করেছিলেন।

[২] বাল্মীকি রামায়ণ ২.৯৬.১-২ অনুসারে শ্রীরাম মাতা সীতাকে খাবার জন্য মাংস নিবেদন করেছিলেন। 


[৩] বাল্মীকি রামায়ণ ৩.৪৭.২২-২৩ অনুসারে মাতা সীতা ব্রাহ্মণ বেশে ছদ্মবেশী রাবণ কে বলছেন "আপনি এখানে বিশ্রাম করুন, আমার স্বামী বন থেকে বিভিন্ন রকমের হরিণ, গোধাঃ, বন্য শূকর শিকার করে নিয়ে আসবেন" 

[৪] বাল্মীকি রামায়ণ ২.৫৬.২৬-২৭ অনুসারে নিবেদনের উদ্দেশ্যে লক্ষ্মণ দ্বারা কৃষ্ণসার শিকার ও মাংস রান্নার উল্লেখ আছে। 

তাহলে বাল্মীকি রামায়ণে প্রাণীজ খাবার গ্রহণের দৃষ্টান্ত পাওয়া গেলো। 



(মহাভারত থেকে দৃষ্টান্ত সমূহ)
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত মহাভারতের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র গুলোর মধ্যে অন্যতম হল যুধিষ্ঠির, যিনি একদিকে সুদক্ষ রাজা অপর দিকে সত্যবাদী এবং ধর্ম জ্ঞানী। ইনিও কিন্তু বনবাস কালে ফলমূল ও মাংস খেয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন।
[ বনপর্ব, আরণ্যকপর্বাধ্যায়]

এখানেই শেষ নয়, বনবাস কালে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে ছিলো বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ। তাদের পোষন করার জন্য যুধিষ্ঠি সূর্যদেবের তপস্যা করেছিলেন এবং একটি তামার স্থালী বর স্বরূপ প্রাপ্ত করেছিলো যাতে আমিষ নিরামিষ সব খাবারই অক্ষয় হয়ে থাকে।
[ বনপর্ব, আরণ্যকপর্বাধ্যায়]

আরো আছে! যুধিষ্ঠি ও তার ভ্রাতাগণ মিলে দ্বৈতবনের অধিকাংশ হরিণ শিকার করে আহার করে নিয়েছিলেন, পরে পশুদের প্রার্থনা শুনে কাম্যকবনে গমন করেন এবং এক বছর আটমাস হরিণের মাংসভোজী হয়ে থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। 
[বনপর্ব, মৃগস্বপ্নোদ্ভব ও ব্রীহিদ্রৌণিক পর্বাধ্যায়] 

ঐ যুধিষ্ঠির আবার এর আগে দশ হাজার ব্রাহ্মণ কে ঘৃত মধু মিশ্রিত পায়স, ফলমূল, বরাহ ও হরিণের মাংস, তিল মিশ্রিত অন্ন প্রভৃতি বিবিধ ভোজ্য দিয়ে তুষ্টি করেছিলেন। 
[সভাপর্ব, সভাক্রিয়াপর্বাধ্যায়]

এটা তো যুধিষ্ঠিরের প্রাণীজ খাবারের আহারের দৃষ্টান্ত গেলো। এখন আরেক বেদজ্ঞ ও সত্যবাদী রাজা নলের মাংস রান্নার দৃষ্টান্ত দেখুন - 
[বনপর্ব, নল-দময়ন্তীর পুনর্মিলন অধ্যায়]

তাহলে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত মহাভারতেও প্রাণীজ আহার গ্রহণের দৃষ্টান্ত পাওয়া গেলো। 



(আয়ুর্বেদ গ্রন্থসমূহ থেকে দৃষ্টান্ত)
বেদ, বিধি বিধান প্রণেত স্মৃতিশাস্ত্র, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত থেকে প্রাণীজ খাবার ভোজনের দৃষ্টান্ত আগেই তুলে ধরেছি। এখন উপবেদ আয়ুর্বেদের অন্যতম প্রাচীন গ্রন্থ চরক সংহিতার কিছু প্রাণীজ আহার ভোজনের দৃষ্টান্ত দেখুন :- 

[১] ডিমের উপকারীতা 
চরক সংহিতা ২৭.৮৭

[২] সুস্থ ও আয়ুবর্ধক হিসাবে মিশ্র খাবারের গুরুত্ব 
চরক সংহিতা ১৬.২২-২৩

[৩] চিকিৎসার কাজে মাছ ও মাংসের ব্যাবহার
চরক সংহিতা ৩.১৯ ও ৫.৫


[৪] ঋতু ভিত্তিক লাইফস্টাইলে প্রাণীজ খাবারের গুরুত্ব
চরক সংহিতা ৭.৪১-৪৮ ও ৬.২৭-৩২


এরসঙ্গে প্রাচীন আয়ুর্বেদের অন্যতম গ্রন্থ, বাগভট মুনির অষ্টাঙ্গহৃদয় সূত্রস্থান থেকে প্রাণীজ খাবার ভোজনের উপকারীতার কিছু দৃষ্টান্ত সমূহ দেখুন :- 
[১] মাংস, পেশীজ চর্বি ও অস্থি মজ্জাগত চর্বির উপকারীতা 
অষ্টাঙ্গহৃদয় সূত্রস্থান ৫.৬৩

[২] মাংসের স্যুপ এর উপকারীতা 
অষ্টাঙ্গহৃদয় সূত্রস্থান ৬.৩২

[৩] শূকরের মাংসের উপকারীতা 
অষ্টাঙ্গহৃদয় সূত্রস্থান ৬.৬৬

তাহলে আয়ুর্ব্বেদ থেকেও প্রাণীজ খাবার আহার গ্রহণের দৃষ্টান্ত পাওয়া গেলো। 


আমি জানি! বিভিন্ন হিন্দুধর্ম সংক্রান্ত গ্রন্থ থেকে এতো গুলো প্রাণীজ খাবার আহারের দৃষ্টান্ত দেখার পর সেইসব কপটাচারীদের অজীর্ণ হবে। তাই তাদের অজীর্ণতা দূবীকরণের জন্য উদ্দেশ্যে কিছু যুক্তিমূলক প্রশ্ন উৎসর্গ করা হল।

[১] প্রাণীজ খাবার আহার করা যদি বেদ বিরুদ্ধ হয় তবে খ্রীষ্টপূর্বের সময়কালের ব্রাহ্মণ, কল্প ও উপবেদের রচনাকাররা কি বেদের জ্ঞান শূন্য ছিলেন? 
[২] বৈদিক গ্রন্থসমূহের প্রাণীজ খাবার আহার করা অংশ গুলি যদি প্রক্ষিপ্ত হয়, তবে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের সাপেক্ষে হিন্দুরা শুদ্ধ নিরামিষভোজী নয় কেনো? 
[৩] যদি বেদের কর্মকাণ্ডের ব্রাহ্মণ, বেদাঙ্গের কল্প, বৈদিক ঋষিদের স্মৃতি ও প্রাচীন আনুষঙ্গিক গ্রন্থ সমূহ মিলে কোনো একটি নির্দিষ্ট বেদ অনুবাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে উক্ত বেদ অনুবাদটির বিশুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? 
[৪] যদি ব্রাহ্মণ ও কল্প গুলো বৈদিক যুগের শেষভাগে প্রচলিত হওয়ার জন্য এগুলো অবিবেচ্য হয়, তবে বৈদিক যুগের প্রথম ভাগে প্রচলিত হওয়া সংহিতার অনুলিপি গুলি বর্তমানে কোথাই আছে? 
[৫] প্রাণীজ খাবার আহার না করলে প্রতিদিনের দৈহিক প্রোটিনের চাহিদা আপনি সস্তা ও সুলভ উপায়ে কিভাবে পূরণ করবেন?
[৬] প্রাণীজ খাবার বা প্রাণীজ উৎস সামগ্রী থেকে পুষ্টি সংগ্রহ না করলে আপনি দৈহিক অপরিহার্য অ্যামাইনো অ্যাসিড ও অপরিহার্য ফ্যাটি অ্যাসিডের চাহিদা পূরণ করবেন কিভাবে? 
[৭] দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রোটিন গ্রহণ না করার ফলে যদি শরীর দূর্বল হয়ে যায় এবং শরীরে বিভিন্ন অপুষ্টিজনিত রোগের উপসর্গ দেখা যায়, তবে তার জন্য দায়ী কে হবে আপনি নিজে না ধর্ম?



Writer & Editor - Samir Kumar Mondal

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মুহাম্মদকে কি ডাকাত দলের সর্দার বলা যাবে?

কোরান আসলে কার বানী ? পর্ব -৭

ইসলাম নারীদেরকে কুত্তা ও শয়তানের সমান বলে নারীকে দিয়েছে সুমহান মর্যাদা